প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
খেলাপি ঋণের ব্যাপক বিস্তার, চরম মূলধন ঘাটতি, ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট এবং দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপের মুখে ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে ২০২৫ সালে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে রেকর্ড ২১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড আর্থিক সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন বা 'ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট'-এ এই উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ব্যাংকগুলোকে রেকর্ড ৩০ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৩১ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এই বিশাল তারল্য সহায়তা মূলত রেপো অপারেশনস, নিশ্চিত তারল্য সহায়তা (এএলএস), ইসলামী ব্যাংক তারল্য সুবিধা (আইবিএলএফ) এবং বিশেষ তারল্য সহায়তা (এসএলএস)-সহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রচলিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত উপকরণের মাধ্যমে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে, যার ৫৯.১১ শতাংশ রেপো এবং ৩৬.৬৭ শতাংশ এএলএসের মাধ্যমে দেওয়া হয়। অপরদিকে, তীব্র সংকটে থাকা ইসলামী ব্যাংকগুলো আইবিএলএফ ও বিশেষ সহায়তার আওতায় পেয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া চরম তারল্য সংকটে পড়া ১১টি ব্যাংককে ১৮ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা (ইএলএ) দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ব্যাংকখাতের এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ভরতার বিষয়ে বলেন, "আমাদের আন্তঃব্যাংক মার্কেট খুব বেশি শক্তিশালী নয়। তাই केंद्रीय ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে রেপো সুবিধা নিয়ে থাকে। তবে এসব অর্থ খুবই সীমিত সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলো ফেরতও দিয়ে দেয়।" তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই স্বল্পমেয়াদি সহায়তা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি দীর্ঘায়িত হলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি বা 'মোরাল হ্যাজার্ড' তৈরি হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং ও সামগ্রিক মূলধন পরিস্থিতি নিয়ে। ব্যাংকখাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) ২০২৪ সালের ৩.০৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে আশঙ্কাজনকভাবে ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সিআরএআর নেমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৩.১৮ শতাংশে এবং এই খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬.১৫ শতাংশ। পাশাপাশি, ব্যাংকের বাইরের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও চরম অবনতির দিকে; যেখানে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩.৩২ শতাংশে পৌঁছেছে এবং মোট আমানত কমে গেছে ৭.০৩ শতাংশ। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশই করপোরেট খাতে কেন্দ্রীভূত, যা পুরো খাতের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে এই সামগ্রিক নেতিবাচক চিত্রের মধ্যেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত থাকায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিএপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী দেশের প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৮.৫৯ বিলিয়ন ডলারে (সাধারণ হিসাবে ৩৩.১৯ বিলিয়ন ডলার)। এছাড়া ২০২৫ সাল শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ৭.৯৮ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যার মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও পেমেন্ট ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও আর্থিক খাতের বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপর্যয় থেকে ব্যাংকখাতকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, দুর্বল ব্যাংকের দ্রুত পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন তদারকি ও সুশাসন নিশ্চিত করা আবশ্যক।
মন্তব্য করুন