শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫   চৈত্র ২১ ১৪৩১   ০৫ শাওয়াল ১৪৪৬

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৬৬০

প্রতিশ্রুতিই শেষ কথা!

  জয়া ফারহানা

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০১৯  

চণ্ডীদাস ঘরানার মধ্যযুগের কবি জ্ঞানদাস। তার লেখা ‘সুখের লাগিয়া’ কবিতাটির ট্র্যাজেডি মনে রাখার মতোই। কবিতাটিতে দেখা যাচ্ছে, কবি সুখের জন্য ঘর বাঁধছেন, অনলে পুড়ে যাচ্ছে। অমিয় সাগরে স্নান করতে যাচ্ছেন অমিয় পাওয়ার আশায়; কিন্তু সবকিছু গরলে ভেল হয়ে যাচ্ছে।

শীতলতার প্রত্যাশায় চাঁদের কিরণ পেতে গিয়ে অনুভব করছেন সূর্যের কিরণ। উচ্চে উঠবেন বলে অচলে (পাহাড়) চড়তে গিয়ে অগাধ জলে পড়ে যাচ্ছেন। সে ছিল মধ্যযুগের ট্র্যাজেডি। কিন্তু এখন যখন আমরা ‘ফাইভ জি’ এবং সুখের জন্য অপেক্ষা করছি, সুখ তখন হয়ে উঠেছে অন্য যে কোনো শতাব্দীর চেয়ে আরও অধরা, আরও অনিশ্চিত।

উপরন্তু এখন কোনটা যে অমিয়, কোনটা যে গরল তাই গুলিয়ে ফেলেছি। ধান বিক্রির মৌসুমে ধানের ন্যায্যমূল্য নিয়ে টানাপোড়েন এবং সংকটের একপর্যায়ে নিজের ধানে কৃষককে আগুন লাগাতে দেখলাম। খামারিদের দেখলাম উৎপাদিত দুধ রাস্তায় ঢেলে দিতে। চামড়া বিক্রির মৌসুমে দেখা গেল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পিঠের চামড়া টিকানোই দায় হয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গু দুর্যোগের অবসান হয়নি এখনও। কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ে মন্ত্রী ও দায়িত্বশীলদের বক্তৃতা-বিবৃতি-মন্তব্য হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর চেয়েও দুর্যোগময়। ডেঙ্গু নাকি ডেঙ্গুবিষয়ক মন্ত্রীদের মন্তব্য কোনটি যে বেশি যন্ত্রণাদায়ক! লাগামহীন এসব মন্তব্য যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্যই হয়তো বলা হয়, সামান্য ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।

কথাটি আসলে ওভাবে বলা হয়নি, বলা হয়েছে এভাবে। আমরা জনগণ যেন বিয়ের জন্য ব্যাকুল প্রতীক্ষারত ভুপেন হাজারিকার ‘মাইয়া ভুল বুঝিস নাই’ গানের সেই দয়িতা। দয়িতাকে বিয়ে করতে না চাওয়ার বারোমাসি অজুহাতের গানটির কথা মনে আছে তো? আমাদের জনগণের দশা হয়েছে ওই দয়িতার মতো।

আর রাষ্ট্রের অবস্থান গানের ওই দয়িতের ভূমিকায়। অজুহাতের শেষ নেই। বৈশাখ মাসে গরমে তেতে পুড়ে ঘেমে নিয়ে যখন জিভ বেরিয়ে আমাদের হাঁসফাঁস দশা, রাষ্ট্র তখন শান্তস্বরে বলে- শুধু কি এদেশেই গরম? কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের (সি৩এস) উপাত্ত বলছে, ইউরোপেই এবার গড় তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

কালবৈশাখীর ঝড়ে প্রাণ গেল কত জনের। রোজার মাসে ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ পড়তে গিয়ে মসজিদের প্যান্ডেল ভেঙে মানুষ মরল। গাছ ভেঙে পথচারী মারা গেল। বজ পাতে মৃত্যু তো ছিলই।

তবে কালবৈশাখী বলে কথা! অকাল, আকাল এসব শব্দ তো কালবৈশাখীর মতো সর্বনাশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মিশে থাকে। ভেবেছি, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ দুটি মাসই তো মোটে। আষাঢ় এলেই শীতল হব। গানের দয়িতার মতো আমরা জনগণ মেনে নিলাম ‘আষাঢ়-শ্রাবণ এলে নেই তো কোনো সংশয়, শুধু বৈশাখী ঝড়কেই ভয়।’

ব্যাকুল প্রতীক্ষায় থাকলাম, কবে আসবে আষাঢ়? আষাঢ় এলো ঠিকই, সময় পরিক্রমায় শ্রাবণও। কিন্তু এলো না সংশয়হীন আষাঢ়-শ্রাবণ। সঙ্গে নিয়ে এলো মহাশঙ্কার ডেঙ্গু। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হল আমরা জনগণ বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখি না, জমা পানিকে ক্ষমা করে দিই, আবর্জনার স্তূপ সরাই না, তাই ডেঙ্গুর এত বাড়বাড়ন্ত। হবে হয়তো।

মেনে নিলাম। কিন্তু নগরীর একেকটি লেক যে মশার খামার হয়ে উঠেছিল, বহুজন বহুভাবে সিটি কর্পোরেশনকে তা জানানোর পরও পেয়েছি কেবল প্রতিশ্রুতি। পথচারী সেতু, রাস্তা ও ফুটপাতের দোকানের ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা ফল মোড়ানোর পলিথিন, ককশিটের বাক্স, ডাবের খোসা দিয়ে এই নগরীর একেকটি লেকপাড়কে আবর্জনার স্তূপে পরিণত করেছিলেন।

সকাল-সন্ধ্যায় লেকের পাড়ে হাঁটতে বেরিয়ে দুর্গন্ধের কারণে না হেঁটে ফিরে আসতে হয়েছে অনেককে। বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ময়লা সড়কের ওপরেই বিছিয়ে রাখা হয়েছে। বাছাই করা কিছু জিনিস বস্তাভর্তি করে রাখা হয়েছে ফুটপাতে।

ফুটপাতে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানের কারণে সংকীর্ণ ফুটপাত সংকীর্ণতর হয়ে উঠেছিল। এখনও সে অবস্থাতেই আছে। অভিযোগ জানালে মিলেছে কেবল প্রতিশ্রুতিই। আর শেষ পর্যন্ত সমাধান না মিললে শোনা যায় অজুহাত। এখনও বেশির ভাগ ফুটপাত হকারের দখলে। কেন?

অজুহাত, হকাররা হকার্স মার্কেটে যেতে চান না। তেজগাঁওয়ের সাত রাস্তার সড়কটি উদ্ধারের পর বহুতল ট্রাকস্ট্যান্ড এবং কারওয়ান বাজারের কাঁচাবাজার যাত্রাবাড়ী, মহাখালী ও আমিনবাজারে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন আনিসুল হক। কেন তা বাস্তবায়ন হল না, উত্তরে আসবে সেই ‘বারোমাসি’ অজুহাত।

দীর্ঘ সময় ধরে এ শহরে গড়ে ওঠেনি কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শীত-গ্রীষ্ম-হেমন্তে ধুলার যন্ত্রণা, বর্ষা শরতে কাদাজল। বছরভর তর্ক ওঠে তুরাগ বেশি দূষিত না বুড়িগঙ্গা? দুটোই দূষিত তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই, তর্ক কেবল কোনটি বেশি তা নিয়ে।

ওয়াটার কিপার্সের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বংশী তীরের কোনো বাসিন্দা এসব নদীর পানি পান করেন না। পানীয় হিসেবে মান সূচকে নিকৃষ্টতম এই পানি। নগরীর প্রায় কোনো শিল্প কারখানারই বর্জ্য পরিশোধন যন্ত্র (ইটিপি) সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না। পঁচাশি শতাংশ ইটভাটা অবৈধ।

এরা কীভাবে দূষণ ছড়াচ্ছে তা শহরের বাতাসের মানসূচক দেখলেই বোঝা যাবে। শুনেছিলাম ২০৩০ সালের মধ্যে বদলে যাবে ঢাকা। ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চালু হবে দেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেল। বিমানবন্দর রুটে চালু হবে দেশের প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল। এই রূপান্তরের জন্য কী পরিমাণ মাশুল যে দিতে হচ্ছে।

মেট্রোরেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ সেসব এলাকায় চলছে যেসব এলাকার বায়ুদূষণ রোধ করতে আদালত পর্যন্ত নির্দেশ দিতে হয়েছে। দূষিত বাতাসের কারণে এ শহরের প্রায় পঁচিশ শতাংশ নাগরিক কোনো না কোনো ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত।

মাত্রারিক্তি বায়ুদূষণের কারণে লিভার, কিডনি বিকল এবং ক্যানসারের মতো রোগ দিন দিন বাড়ছে। দূষিত বাতাসের দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে কী পদক্ষেপ আছে? শহরের ভেতরের শিল্প-কারখানাগুলো অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতে সরবে তেমন সম্ভাবনা দেখি না।

যাত্রীকল্যাণ সমিতি এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউটের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, প্রতিদিন গড়ে বিশজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আহতের সংখ্যা এর দ্বিগুণেরও বেশি। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া হলে ধর্মঘটে নেমে পড়েন তারা।

২০২৪ সালের মধ্যে দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। এক ঈদযাত্রাতেই প্রাণ গেছে ২৫০ মানুষের। প্রতিকার চেয়ে উত্তর মিলবে, হতে যাচ্ছে, হবে...।

বিকল্প হিসেবে নৌপথে যাত্রা করবেন? নৌপরিবহন খাতের দশা আরও করুণ। নৌযান চালকদের যোগ্যতা নির্ধারণী পরীক্ষা গ্রহণে মাস্টারশিপ ও ড্রাইভারশিপ নামে দুটি পৃথক বোর্ড আছে। মাস্টারশিপ পরীক্ষা বোর্ডের প্রধান নৌ অধিদফতরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার।

ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নৌ অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী যিনি, একই সঙ্গে নকশা অনুমোদন কমিটিরও আহ্বায়ক। দুটি কমিটিতেই ভিন্ন সংস্থার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে যা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। কেন এটা করা হল? অযোগ্য প্রার্থীদের অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেয়ার জন্য ছাড়া আর কী জন্য?

জুন মাস এলে আমরা জনগণ আতঙ্কে থাকি নতুন করে আবার কোন কোন পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ হয়। এ বছর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তে পারে এমন কোনো জিনিস অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

কিন্তু বাজেটের পর দেখা গেল এমন কোনো জিনিস নেই যার দাম বাড়েনি। আমরা বাজেট-অজ্ঞরাও জানি রাজস্ব আদায়ের বড় উৎস মূল্য সংযোজন কর যা সরাসরি দেন ব্যবসায়ীরা কিন্তু টাকাটা যায় মূলত আমাদের মতো সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে।

এবারের অর্থবছর শুরু হয়েছে ১৭৫ টাকা বাড়তি গ্যাস খরচ দিয়ে। আর এই মুহূর্তে পেঁয়াজের দামের ঝাঁঝে কেঁদেও কূল পাচ্ছি না। এটা নাকি পেঁয়াজ মৌসুম শেষের মূল্যবৃদ্ধি। আশ্বাস আছে, পেঁয়াজের নতুন মৌসুম শুরু হলে দাম কমবে। সেই আশ্বাস, সেই প্রতিশ্রুতি!

ক্যালেন্ডার বছর শুরু হয়েছে সুমন মিয়া নামের এক শ্রমিকের রহস্যময় হত্যার মধ্য দিয়ে। সেচ মৌসুম শুরু হলে কৃষক আশঙ্কায় থাকেন প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাবেন কিনা। এ বছরও পাননি চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ। অবশ্য প্রতিশ্রুতি আছে সামনের বছর পাবেন।

একাদশ শ্রেণীর শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে দেখা যায় কয়েক লাখ শিক্ষার্থী ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারেনি। সম্মান শ্রেণীর শিক্ষাবর্ষ শুরু হলে দেখা যায় অধিকাংশই ভর্তি হতে পারেননি কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে এখানেও আছে প্রতিশ্রুতি, সেটা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানোর।

২.

এই ভাদ্রে ডেঙ্গু, বন্যা, চামড়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ে যখন হিমশিম খাচ্ছি তখন এর সবকিছুরই সমাধানের জন্য দেয়া আছে বিস্তর প্রতিশ্রুতি। সামনে আছে আরও ভালো থাকার চমক। আসলে শেষমেশ কপালে জুটবে প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার অজুহাত। কর্তৃপক্ষ তখন বলবেন ‘মাইয়া ভুল বুঝিস নাই’।

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

এই বিভাগের আরো খবর