শুক্রবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৫   চৈত্র ২১ ১৪৩১   ০৫ শাওয়াল ১৪৪৬

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৬৬৪

গল্প নয়, সত্যি!

প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২০  

 

একদিকে করোনা মহামারীর প্রকোপ। অন্যদিকে টানা কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিপাত। এসবের মধ্যেই থানা এলাকায় অজ্ঞাত ব্যক্তি কর্তৃক খুনের সংবাদ প্রাপ্তি। চিরচরিত নিয়ম অনুযায়ী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই আমার নেতৃত্বে গঠিত টিম ইপিজেড। মৃতদেহের সমস্ত আইনী কার্যক্রম শেষে লাশ মর্গে প্রেরণ করে খুনের রহস্য উদঘাটনের জন্য উঠেপড়ে লাগি। 

প্রথম দিকে খুনের রহস্য উদঘাটনে একটু বেগ পেতে হলেও হতাশ না হয়ে টিম ইপিজেডকে সাথে নিয়ে ঘটনার পেছনে ছুটতে থাকি। এরই মধ্যে পুলিশি কলাকৌশল অবলম্বনে জানা যায় যে, নিহত মারিয়ার স্বামী তার প্রকৃত নাম ঠিকানা গোপন করে একেক জায়গায় একেক ছদ্মনাম ধারণ করে এবং মিথ্যা পরিচয়ে মারিয়াকে বিয়ে করে। মারিয়ার মৃত্যুর সংবাদ পেয়েও তার স্বামী  দূরে আছে ও আসছি-আসবো বলে গড়িমসি করে এবং চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে অদূরে পারি জমাচ্ছে।

এসব বিষয় নিয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে মৃত্যুর সংবাদ গোপন করে নিহত মারিয়াকে চিকিৎসাধীন ঘোষনা করে কখনো ডাক্তারের ছদ্মবেশে , কখনো তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির সহায়তায় টিম ইপিজেডের সকল সদস্যকে সম্ভব্য সকল স্থানে ছদ্মবেশে মোতায়েন করে ঘটনা সংঘটনের মাত্র ৮ ঘন্টার মধ্যেই টিম ইপিজেডের জালে ফেলে নিহতের স্বামী সোহাগ হাওলদারকে হস্তগত করা হয়।

চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশি জিঞ্জাসাবাদে ঘটনার সংশ্লিষ্টতার কথা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে, স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যাক্তিদের দায়ী করে। কিন্তু টিম ইপিজেডের চৌকস পুলিশ অফিসারদের প্রবল জিঞ্জাসাবাদের মুখে এক সময় স্বামী সোহাগ হাওলদারের প্রতিরোধের দেয়ালে ফাটল ধরে। শেষ পর্যন্ত স্বীকার করে যে, তার স্ত্রীর পরকীয়া আসক্তির কারনে তাকে পরকীয়া হতে ফেরাতে না পারায় স্ত্রীকে দুনিয়া থেকে চিরতরে খতম করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। সেই মোতাবেক গত ১৭/০৬/২০২০ খ্রি. তারিখ সকাল ৮.০০ ঘটিকার সময় তার শ্বাশুড়ীর বাসায় তার স্ত্রী ব্যাতীত কেও না থাকায় এবং ঐ সময়ে ভারী বর্ষন হওয়ায় বাসা বাড়ীর আশেপাশে কোন লোকজন না থাকার সুযোগে গোপনে শ্বাশুড়ির বাসায় প্রবেশ করে স্ত্রী মারিয়া আক্তার মালা (২০)’র গলা ও মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে লোকচক্ষু ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়, যাতে তার শাশুড়ী সহ তার আত্মীয় স্বজন ধারণা করে যে, অজ্ঞতনামা কেউ অজ্ঞাত কারণে নিহত মারিয়া আক্তার মালাকে হত্যা করেছে।

ফুটফুটে যেই মেয়েটি শ্বশুড়বাড়িতে আনন্দে মেতে থাকার কথা ছিল, তার নিথর দেহ আজ চিকিৎকের বেরসিক ছুরির নিচে। মেহেদীর রঙ শুকানোর আগেই মারিয়া আজ অন্ধকার কবরের বাসিন্দা। 

নিহত মারিয়াকে পুলিশ ফেরত আনতে পারবে না, তবে হত্যার সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে তার বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। 

তাই বৈরী আবহওয়া উপেক্ষা করেই মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথে মাঠে নামি। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সার্বিক দিকনির্দেশনায়, অফিসার ইনচার্জ মহোদয় ও সহকর্মীদের প্রেরণায় এবং সকল অধস্তনের কর্মতৎপরতায় হত্যাকাণ্ড সংঘটনের মাত্র ৮ ঘন্টার মধ্যে হত্যার রহস্য উদঘাটন ও সকল তথ্য প্রমাণাদি সাপেক্ষে ঘটনায় জড়িত আসামীকে বিচারার্থে আদালতে সোপর্দ করতে পারায় পরম করুণাময় মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি, 'আলহামদুলিল্লাহ'।

অপরাধ বিজ্ঞানীদের ভাষ্য মতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের আপনজনই তার ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়। তাই সম্পর্ক গুলো সযতনে রাখুন, আপনজনকে আপন করে রাখুন। 

লেখকঃ মোহাম্মদ হোসাইন 
পুলিশ পরিদর্শক 
সিএমপি

এই বিভাগের আরো খবর